img

বুদ্ধের অনুপম ব্যক্তিত্ব

June 22, 2020

ড. বরসম্বোধি ভিক্ষু

দীর্ঘ নিকায়ের পারম্ভিক সুত্র ব্রহ্মজাল সুত্রানুসারে বুদ্ধ স্বীয় ভিক্ষু সংঘের সাথে একবার রাজগীর এবং নালন্দার মাঝখানে যাত্রা করছিলেন। সে সময় সুপ্রিয় পরিব্রাজক এবং তাঁর শিষ্য ব্রহ্মদত্তের মধ্যে বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘকে নিয়ে বাদ-বিবাদ চলছিল। তাঁদের মধ্যে একজন ত্রিরত্নের নিন্দা করছিলেন এবং অন্যজন করছিলেন প্রশংসা। এ বিষয় জ্ঞাত হয়ে বুদ্ধ ভিক্ষু সংঘকে সে প্রসঙ্গ বুঝাতে গিয়ে বলেছেন যে,

‘ ভিক্ষুগণ! যদি কোন ব্যক্তি বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের নিন্দা করে থাকে, তোমরা তাঁর সাথে বৈরিতা দেখাবে না, বা অসন্তোষও প্রদর্শন করবেনা, অথবা চিত্তে কোন ক্রোধও উৎপন্ন করবে না। এরকম করলে নিজেরই অনেক হানি বা ক্ষতি হয়ে থাকে। বরং সত্যের অনুসন্ধান করা উচিত যে, যেগুলি বলা হচ্ছে, তা কি সত্যি না মিথ্যা?

আবার যদি কেহ বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের প্রশংসাও করে থাকে, তাতেও তোমরা আনন্দিত হবেনা, বা প্রসন্নতা উৎপাদন করবে না, অথবা হর্ষোৎফুল্লতা হওয়াও উচিত নয়। এরকম করলেও নিজেদের হানি বা ক্ষতি হয়। বরং তখন সত্যের অনুসন্ধান করা উচিত যে, যা কিছু বলা হচ্ছে, তা সত্যি বলছে, না মিথ্যা বলছে? ‘

এভাবে বুদ্ধ দীর্ঘ নিকায়ের প্রারম্ভিক সুত্রে সত্যকে জানার জন্য প্রেরণা যুগিয়েছেন। এ প্রকারের স্বতন্ত্রতাকে বুদ্ধ অতীব উচ্চস্তরে পৌঁছিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে, সত্যি কঠিন স্তর হতে প্রাপ্ত হলেও যদি তা যথার্থ হয়, তা অবশ্যই স্বীকার করে নিতে হবে। সাথে সাথে বুদ্ধ এ বার্তাও দিয়ে থাকেন যে, যদি কোন কথা বুদ্ধের সম্পর্কেও বলে থাকে, তাহলে তারও সত্যতা যাচাই করবে। কারো কোন কথা বিনা বিচারে, বিনা পরীক্ষায় গগ্রহণ কিংবা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবে না।’ এ প্রকার স্বাধীনতা বা স্বতন্ততা অন্য কোথাও আমরা দেখতে পাইনা।

অনেকবার তো দেখা যায়, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের যে সমস্ত মূল সিদ্ধান্ত বা মতবাদ রয়েছে, সেগুলিকে যদি কেহ কোন সমালোচনা বা বিরুপভাব পোষণ করেন, তাহলে বড়ই সেখানে ঝগড়া -বিবাদ বা তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। কি করে আপনি আমাদের ধর্মের এ মূল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আঙ্গুল তুলেছেন? তাতে যদি আপনি যুক্তি-উপমার সাহায্যে সত্যতাও প্রমাণিত করতে চান, বা প্রমাণ করেও দেন, তারপরেও তা তাঁরা স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকেননা।আপনাকে শত্রু মনে করবে বা আপনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখাতে থাকবে। সত্য প্রকাশ করলেও তাঁরা তা মেনে না নিয়ে কূট তর্ক করে নিজের এবং অন্যের ভয়ানক দু:খ ও অশান্তি সৃষ্টি করতে থাকেন। এমনকি প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যও ফেঁপে-ফুলে উঠে থাকেন।সে এক বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যায়। সেদিক হতে বুদ্ধের ব্যক্তিত্ব হল সম্পূর্ণ পৃথক। তিনি বলছেন, কোন প্রকার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে সত্যতা যাচাই করতে। এমনকি বুদ্ধের স্বীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বললেও তাতে ক্রোধান্বিত না হয়ে তাকেও যাচাই করতে বলেছেন। বুদ্ধের সিদ্ধান্তকেও বিনা বিচারে গ্রহণ ও স্বীকার করতে তিনি নিষেধ করেছেন। এতদূর স্বাধীনতা অন্য কোন ধর্মগুরু বা ধর্মীয় মতবাদে পাওয়া যায়না। সত্যকে দর্শন করে ও তা স্বীকার করে নেওয়া হল বুদ্ধের শিক্ষার বড় প্রমুখ বিশেষতা। জীবনের সত্যকে জানার প্রয়াসে বুদ্ধ দ্বারা প্রদর্শিত মার্গে যথার্থবাদী হওয়া ইহা এক বিশিষ্টতা প্রদান করে।

ইহা এক উদাহরণ দ্বারা আমরা বুঝতে চেষ্টা করব। পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্ম সমূহের মধ্যে নিজেদের সম্বন্ধে আমরা বুঝতে চেষ্টা করি যে, জীবন কি? জীবন কিভাবে চলছে? ইত্যাদি। প্রত্যেক ধর্ম এ সম্পর্কে ভালভাবে চিন্তন- মনন তো করেছে, এবং সমস্ত ধর্মই স্বীয় স্বীয় সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করেছে। সমস্ত ধর্মের আলোকে যদি আমরা বিচার করি যে, আমাদের জীবনে যে দু:খ সমূহ আসে, সেগুলির কারণ কি? কেন আমাদের জীবন দু:খ হতে ভরপুর থাকে? এ দু:খ এসে জীবনকে কেন ব্যথিত করে? এগুলি বড়ই মূল প্রশ্নরূপে দেখা দেয়। ইহাতে আমরা দু’ প্রকার উত্তর পেয়ে থাকি।

প্রথম প্রকার উত্তর হল, আমাদের জীবনে যে রকম কর্ম করা হয়, তার সেরকম ফল ফিরে আসবে।যেমন, যদি কোন ব্যক্তি চুরি করে, সেখানে যদি সে ধরা পড়ে, তাহলে তাকে সেখানে দণ্ড প্রদান করা হয়। দণ্ড লাভ করার কারণে সে দু:খিত হবে এবং তাতে সদা দু:খ বেদনা বা ব্যথা অনুভব করবে। এখানে এ কথা তো আমরা সকলে বুঝতে পারি। আমাদের জীবনে এরকম অনেক ঘটনা ঘটে থাকে যা আমাদের বিচার বা স্বভাব সমূহ হতে উৎপন্ন হয়ে থাকে। যেমন, কারো সাথে যদি ক্রোধান্বিত হলে, বা কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদ করলে, ইহার পর যে উৎপন্ন হওয়া দু:খ, তা তো আমরা বুঝতে পারি যে, এগুলো আমার কর্মের দ্বারা উৎপন্ন হয়েছে। জীবনে এরকম অনেক দু:খ রয়েছে, যেগুলো আমরা জীবনের ঘটনাবলীর সাহায্যে বুঝতে পারি যে, এগুলি আমাদের কর্মের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে।

এভাবে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দ্বিতীয় প্রকার উত্তরে ইহাও দেখব যে, জীবনে অনেক প্রকার দু:খও রয়েছে, যেগুলি কর্মের দ্বারা যে সৃষ্টি হয়েছে, তা কিন্তু প্রতীয়মান হয়না।নিজেরাই দেখবেন, আমি জীবনে কোন প্রকার ভূল বা মন্দ কর্ম করি নাই, তথাপি কেন দু:খ ভোগ করছি? উদাহরণ স্বরূপ এরকম অনেক কিছুর প্রমাণ দেওয়া যায়, সেগুলির সাথে কর্মের কোন সম্বন্ধ দেখা যায় না। সে রকম দু:খ উৎপন্ন হয় কেন? এ সম্পর্কে উদাহরণ দিলে তা বুঝতে অনেক সহজ হবে বলে মনে হয়। যেমন, এক ছোট বাচ্চা, যে জন্ম গ্রহণ করার কিছু দিন পরেই মৃত্যু বরণ করল। এ যে নবজাত শিশুর মৃত্যু হল, সে এরকম কি খারাপ কর্ম করেছে যে, যার কারণে তাকে মৃত্যু দু:খ ভোগ করতে হয়েছে? এখানে আমাদের একটু অন্য রকম প্রতিক্রিয়া এসে যায়। এরকম যে দু:খ, তা তো কর্মের সাথে যুক্ত দেখিনা। সে বাচ্চার কি ভুল ছিল, যার প্রভাবে তাকে মৃত্যুর মত মহাদু:খ ভোগ করতে হয়েছে? এ দু:খ সম্পর্কে যখন আমরা চিন্তা করি, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়ে থাকে। এখানে মানুষ ঈশ্বরের মত কোন সত্ত্বার অস্তিত্ব এনে থাকে। এ রকম যা কিছু ঘটতে থাকে, তা হল ঈশ্বরের ইচ্ছা বলে মানুষ মনে করে।অধিকাংশ মানুষ এখানে এরকম উত্তরই দিয়ে থাকে।

যদি আমরা ইহুদী, খৃষ্টান এবং ইসলাম ইত্যাদি মধ্যকালীন ধর্মসমূহ দেখি, সে সকল ধর্মে মান্যতা দেয় যে, এ জাতীয় যত ঘটনা ঘটে থাকে, সে সব ঈশ্বর, খোদা বা আল্লাহর ইচ্ছায় হচ্ছে বলে মত প্রকাশ করে থাকেন। কেননা, তাঁর মর্জিই হল এরকম। তিনি যা ইচ্ছা করেন, সেরকমই তিনি মর্জি মাফিক করে থাকেন।

এ সম্পর্কে যদি আমরা ভারতীয় ধর্ম সমূহে দেখি, সেখানেও ঈশ্বরের মর্জি বা লীলা বলে থাকেন এবং কোন কোন স্থানে ইহার জন্য পূর্ব জন্মের কারণকে দায়ী করা হয়। বলা হয়, সে পূর্ব বা আগের জন্মে কোন মন্দ কর্ম বা কাউকে হত্যা করেছে বা হত্যার কারণ হয়েছে, সে কারণে এখানে অল্পায়ু হয়ে জন্ম নিয়ে মৃত্যু বরণ করেছে।

এখন এখানে এ প্রশ্ন উত্থাপন হয়ে থাকে যে, যদি এ সকল ঘটনার পিছনে ঈশ্বরের মর্জি বা ইচ্ছা থেকে থাকে, তাহলে আশ্চর্য লাগে যে, তিনি কি রকম ঈশ্বর? তিনি কি প্রকার ঈশ্বর , যিনি খেয়াল খুশি মাফিক সব করে থাকেন? আবার তাঁদের ধর্মগ্রন্থ সমূহে এ কথাও বলা হয়েছে যে, ঈশ্বর বা খোদা বা আল্লাহ হলেন পরম দয়ালু। তিনি পরম কৃপালু। তিনি পরম মেহেরবান প্রদর্শনকারী। তাঁর মত কৃপা, দয়া ও মেহেরবান আর অন্য কেহ করতে পারেননা। তা যদি হয়, এখানে প্রশ্ন আসে যে, দয়ালু, কৃপালু ও মেহেরবানকারী হলে মানুষকে এরকম দু:খ কেন প্রদান করেন? এ প্রকার দু:খের পেছনে কি ইহাই সত্য?

এরকম আমাদের জীবনে অনেক প্রকার দু:খ এসে থাকে, যেগুলির সাথে কর্মের কোন সোজা সম্বন্ধ খুঁজে পাওয়া যায়না। আমরা জীবনে সে ধরণের মন্দ কর্ম না করা সত্বেও চলমান পরিস্থিতিতে দু:খ ভোগ করে থাকি। যদি আমরা সমস্ত ধর্মের ব্যাপারেও বলি, তাহলে সে ধর্মগুলোতে এরকম প্রশ্নের কোন উত্তর পাওয়া যায়না। যে কারণে লোক ঈশ্বরকে মান্য করে থাকে, সে কারণ তো লোকের জানাও নাই। কেন ঈশ্বর এগুলি করে থাকেন? ঈশ্বর মানুষকে এরকম দু:খ দিয়ে, তিনি নিজের বিচার ধারা, বা নিজের অস্তিত্বের পরিচয় দিয়ে থাকেন বলে মানুষ মনে করে। এত কিছুর পরেও তিনি মেহেরবান, তিনি কৃপালু এবং তিনি দয়ালু। এত দয়ালু, কৃপালু হওয়ার পরও মানুষকে তিনিই অহরহ দু:খ দিচ্ছেন কেন?

এখন এখানে অন্য প্রশ্নও আসতে থাকে যে, ইহার পেছনে অন্য কোন কারণ কি নাই?আমাদের জীবনে এ সমস্ত দু:খ ভোগের পেছনে কি সত্যতা রয়েছে? দু:খের পেছনে অন্য সত্য কি লুকিয়ে রয়েছে? যা মানুষ জানতে পারছে না?

এ সম্পর্কে তথাগত বুদ্ধ এক বিশেষ বার্তা দিয়ে থাকেন। বুদ্ধ এ সম্পর্কে যে রায় প্রদান করেন, তা বড়ই অদ্ভূত ও অদ্বিতীয়। বুদ্ধ সমস্ত সুখ এবং দু:খকে জীবনের অংশরূপে বর্ণনা করেছেন। জীবনে যখন সুখ বেদনা আসে তখন মানুষ সুখ বেদনার প্রতি আকর্ষিত হতে থাকে, এবং দু:খ বেদনা যখন আসে, তাতে যে দু:খানুভূতি উৎপন্ন হয়, সেগুলি হতে মানুষ দূরে থাকতে চেষ্টা করে। যেহেতু মানুষ সুখ বেদনা চায়, সেহেতু সেদিকেই মানুষ বেশী আকর্ষিত হয়। দু:খ বেদনা কেন উৎপন্ন হয়, যার কারণ মানুষ নিজে নয় বলে মনে করেন, সে কারণে মানুষ তা পছন্দ করেননা। ঈশ্বরকেই ইহার কারণ বলে অধিকতর মানুষ বলে থাকেন। কিন্তু বুদ্ধ এখানে অন্য দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন।

বুদ্ধের মতে, এ জীবনকে সুখরূপে মনে করা বা কল্পনা করা হল মানুষের সবচেয়ে বড় ভুল। জীবনের প্রথম আর্যসত্য হল এ জীবন দু:খ দ্বারা ভর্তি হয়ে রয়েছে। এ জীবন হল দু:খময়। অর্থাৎ জীবনই হল দু:খ। ইহা হল জীবনের প্রথম আর্যসত্য। এ সত্য প্রত্যেককে স্বীকার করতেই হবে। এ সত্যকে স্বীকার না করলে জীবন যে দু:খময়, তা সঠিকভাবে বুঝতে পারবেনা। এ প্রকারে দেখলে বুদ্ধ জীবনের প্রথম সত্যকে স্বীকারের কথা বলেছেন। সমগ্র জীবনই হল দু:খময়। এ সত্যকে স্বীকার করা উচিত। কেহ কেহ বলে থাকেন যে, ইহা তো বড়ই নিরাশাবাদী। দু:খ বলে মান্য করা বা জীবন যে দু:খে ভরা, তা মনে করা মানুষকে নিরাশার জন্ম দিয়ে থাকে। ইহাই মানুষ বলে থাকেন।

তা এক উদাহরণের সাহায্যে আমরা বুঝতে চাইব। যেমন, এক শহরের অবস্থান হল সমুদ্রের পাড়ে। সে শহরের লোক সংখ্যাও অনেক। সেখানে লোক সংঘর্ষের মাধ্যমে বা কষ্টের মাধ্যমে জীবন অতিবাহিত করতে থাকে। তথায় হঠাৎ তুফান বা জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়। সে জলোচ্ছ্বাস বা তুফান শহরকে তছনছ করে দেয়। এ তুফানের দ্বারা সেখানে কি রকম ধ্বংস যজ্ঞ হতে পারে , বা মানুষের জীবনকে কত দুর্বিসহ করে তোলে, তা আমরা সমসময়িক ঘটে যাওয়া সুনামি সমূহ হতে আন্দাজ করে নিতে পারি।

এ সুনামি বা তুফান অথবা জলেচ্ছ্বাস কত ভয়াবহ হতে পারে, তা যদি পূর্ব হতে ঘোষিত করা হয়, এবং পূর্ব হতেই সে সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা হয়ে যায় যে, এরকম মারাত্মক তুফান আসছে, তাহলে তা সামাল দেওয়ার বা নিজেদের সুরক্ষা করার কিছু ভাল ব্যবস্থা মানুষ করে নিতে পারে। তুফান কখন আসছে, কত বেগে আসছে, কতক্ষণ স্থায়ী হবে ইত্যাদি বিষয় যখন লোক পূর্ব হতে সঠিক ধারণা পায়, সেখানে আত্মরক্ষার কিছু উপায় মানুষ বের করতে পারে। তাতে জানমালের ক্ষতিও কম হতে বাধ্য। এখন উভয় পরিস্থিতির যদি আমরা তুলনাত্মক অধ্যয়ন করি, প্রথম পরিস্থিতিতে সুনামী বা তুফান সম্পর্কে মানুষের কোন তথ্যই জানা নাই। কখন, কিভাবে, কত শক্তিতে তুফান আসছে, তার কিছুই না জানার কারণে মানুষ সাধারণ ভাবে সব কিছু করে যাচ্ছে। যেমন, জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া হতে শুরু করে সব কিছু দৈনন্দিনভাবে করতে থাকছে। এ অবস্থায় হঠাৎ তুফান শুরু হলে, যা লোকসান হবে, সমুদ্রে কিংবা সমুদ্র উপকুলবর্তী শহরে যে ক্ষতি হবে, তা কল্পনারও অতীত হতে পারে। জানমাল সবকিছুকে সেখানে বিরান করে দিতে পারে। ঘরবাড়িসহ সব কিছু লন্ডভন্ড করে ছুনছান করে দিতে পারে। এরকম হওয়ার কারণ হল, তুফান বা জলোচ্ছ্বাস কখন, কিভাবে, কত শক্তিতে আসছে, তার কোন তথ্য সম্পর্কে না জানা। এ জন্য সে তুফান বেশী বিধ্বংসী হয়ে ক্ষতি করে দেবে।

অপরপক্ষে যদি সুনামী বা তুফান সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া যায়, অর্থাৎ কখন, কত শক্তিতে, কিভাবে আসছে, কতক্ষণ স্থায়ী থাকবে, সব কিছু যদি পূর্ব হতে সঠিক তথ্য জানা থাকে, তাহলে পূর্ব হতে লোক সতর্কতা অবলম্বন করে প্রস্ততি নেবে।তারা সমুদ্রে যাবেনা, ঘরকে মজবুত করবে, বা নিজেরা নিরাপদে স্থানে সরে যাবে, গবাদি পশুকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে রাখবে। এভাবে নানা সতর্কতা অবলম্বন করে নিজেদের সুরক্ষা করতে চেষ্টা করবে। এতে তুফান আঘাত আনলেও সেখানে অপেক্ষাকৃত লোকসান কম হবে, যেরকম অতর্কিত তুফানে লোকসান করে থাকে। এখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, উভয় তুফানের বিধ্বংসতায় পার্থক্যতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।

অনুরূপভাবে, মানুষ জীবনের সত্যতা সম্পর্কে জ্ঞান পূর্ব হতে যদি জেনে থাকে অর্থাৎ জীবন দু:খময়, তা পূর্ব হতে সম্যক জ্ঞান বা ধারণা থাকলে, তাতে দু:খ জনিত লোকসান তাদের কম হবে, যেরকম লোকসান তাদের হবে, যারা দু:খ সম্পর্কে জানেই না। দু:খ সম্পর্কে যাদের জ্ঞান নাই, বা ধারণা নাই, তারা দু:খে কাতর হয়ে বেশী কষ্ট ভোগ করতে থাকবে, হাহুতাশ, বিলাপ, ক্রন্দনও বেশী করতে থাকবে। জীবনের ভয়াবহতার শিকারও তুলনা মুলকভাবে তারা বেশী হবে।

এজন্য বুদ্ধ বার বার সতর্ক করে দিতে গিয়ে জীবনে যে দু:খ আছে, তা সম্যকরূপে ও সঠিকরূপে জানতে বলেছেন। সত্যকে জানলে ও বুঝতে পারলে, জীবনে আসা দু:খের পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে সামাল দিতে পারবে। তাতে দু:খেরও লাঘব হবে। একারণে দু:খের জ্ঞান হওয়া খুবই আবশ্যক। দু:খের জ্ঞান থাকলে জীবনের ভয়াবহতার প্রতি বেশী সাবধানী হওয়া যায়। তাই বুদ্ধ বলেছেন যে, মানুষের জীবনে চলমান ঘটনাক্রমের প্রতি যথার্থ জ্ঞান থাকতে হবে। তাহলেই জীবনকে ভালমতে বুঝতে পারবে এবং জীবনের পরিস্থিতি সমূহকে নিজের মত করে মোকাবিলা করে সুন্দর জীবন-যাপন করতে পারবে। যেমন, পূর্ব হতে সুনামী সম্পর্কে ধারণা থাকলে সে অনুসারে পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সুযোগ পায়, অনুরূপভাবে জীবনে যে দু:খ আছে, তাঁর সঠিক জ্ঞান থাকলে তাও মোকাবিলা করতে সহজ হয়।

বুদ্ধের অনিত্যবাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যদি কারো জীবনে দু:খ এসেও থাকে, তাও তিনি জানেন যে, এ দু:খ স্থায়ী নয়। ইহা হল অনিত্য, চিরস্থায়ী থাকার জন্য নয়। এসেছে, আবার চলেও যাবে। এ অনিত্য ও দু:খ জ্ঞান মানুষের থাকলে তাতে দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন হয়। তাতে সুন্দর ও উৎকৃষ্ট জীবন যাপনের সুযোগও সৃষ্টি হয়। একারণে বুদ্ধ দু:খ সম্পর্কে জ্ঞান দিতে আর্যসত্যে ইহাকে প্রথম স্থান দিয়েছেন। দু:খকে বুঝাতে চেয়েছেন। দু:খ যে জীবনের সঙ্গী তা জানিয়ে দিয়েছেন। এ দৃষ্টিকোণ হতে দেখলে বুদ্ধের ব্যক্তিত্ব পৃথিবীর অন্যদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনুপম।

Article Categories:
Uncategorized

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *