img
buddha

বুদ্ধবাণীর খাঁটিত্ব পরীক্ষা করতে বুদ্ধের নির্দেশিত পদ্ধতি

May 18, 2020

বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন ভগবান মহাবীর। পালি সাহিত্যে তাঁকে নিগন্ঠ নাথপুত্র বলে উল্লিখিত হয়েছে। বুদ্ধের সময়ে যে ছয়জন স্বনামধন্য আচার্য ছিলেন এবং যাঁরা নিজেদের ভিন্ন ভিন্ন দর্শন প্রচারের জন্য খ্যাতি লাভ করেছিলেন তাঁদের মধ্য নিগন্ঠ নাথ পুত্র ছিলেন অন্যতম।

বুদ্ধের পূর্বে ভগবান মহাবীর দেহত্যাগ করেছিলেন। তাঁর দেহত্যাগের পর তাঁর উপদেশ সমূহকে নিয়ে শিষ্যদের মধ্যে বড়ই বিবাদ উৎপন্ন হয়েছিল।

ভগবান বুদ্ধ যখন বৈশালীর চাপাল চৈত্যে স্বীয় পরিনির্বাণের দিন ঘোষণা দিয়েছিল্ন, তখন বুদ্ধের প্রধান সেবক আনন্দ ভন্তের মনেও চিন্তা এসেছিল যে, তথাগতের পরিনির্বাণের পর সংঘ এবং সদ্ধর্মের স্থিতি কেমন হবে।

একদিন ভদন্ত আনন্দ স্থবির অনেক বিহ্বল হয়ে ভগবানের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাসাই করে ফেললেন যে, ‘ভন্তে,ভগবান! মহাবীরের শিষ্যদের মধ্যে মহাবীরের উপদেশ সমূহকে নিয়ে ভারী মতভেদ বা বিবাদ উৎপন্ন হয়েছে। আপনার পরিনির্বাণের পর ভিক্ষু সংঘে এরূপ স্থিতির সম্ভাবনাকে নিয়ে আমি অতীব চিন্তিত ও ব্যথিত হচ্ছি। ভগবান! লোক হিতে এ বিবাদ এড়াতে নিদান দিয়ে সকলকে অনুকম্পা করুন।

বুদ্ধ অত্যন্ত করুণা সিক্ত হৃদয়ে আনন্দ স্থবিরের ব্যথাকে উপলব্দি করে তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন যে, আনন্দ! আমার বচনের সত্যতা যাচাইয়ের দু’প্রকার সর্বকালিক পদ্ধতি রয়েছে। কি সে দু’ প্রকার পদ্ধতি?

১) আনন্দ! তথাগতের উপদেশের সার হল সাইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় সম্বন্ধিত ধর্মোপদেশ। তথাগতের পরিনির্বাণের পর বিবেকবানদের জন্য এ সাইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্মই তথাগতের সমস্ত উপদেশ সমূহের সত্যতা পরীক্ষার জন্য মান্যতা থাকবে। যে কেহ কখনও যখন তথাগতের উপদেশ সমূহের অনুশীলনে কখনও কোন বিষয়ে ভ্রম বা সংশয় হলে বা সে উপদেশের সত্যতায় শঙ্কা উপস্থিত হলে, তখন তাকে পরীক্ষা করতে হবে যে, এ উপদেশ বা সুত্র সাঁইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্মের অনুকুল আছে বা সমর্থনে রয়েছে কি? যদি পরীক্ষায় ইহা তথ্য মিলে যায় যে, এ উপদেশ সাঁইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্মের অনুকুল রয়েছে, তখন তাঁকে তাতে আশ্বস্ত হতে হবে যে, নিশ্চিতরূপে এ উপদেশই হল বুদ্ধবচন। তদনুসারে তখন তাতে সাধনাভ্যাসে শ্রদ্ধাভাব উৎপন্ন করে সমর্পিত হতে হবে। কিন্তু সে উপদেশে সাঁইত্রিশ প্রকার বোধপক্ষীয় ধর্মের অনুকুল তথ্য না পাওয়া গেলে তখন বুঝতে হবে যে, ইহা বুদ্ধবচন নয়। এবং উপেক্ষিত করে ক্রমশ: বুদ্ধ বচনের শ্রদ্ধাবনত হতে অগ্রসর হতে হবে।

কোন সেই সাঁইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্ম যা বুদ্ধ অনুশীলন করতে বলেছেন?

লোক বিনায়ক তথাগত বুদ্ধের ইহা মহা অনুশাসনী ঋদ্ধিবলই যে সম্বোধি অমৃত জ্ঞান সাগরে যথাযোগ্য মুমুক্ষু , তপস্বী, যোগী, সাধক, ভোগী, রাজা, চোর, ডাকাত, গণিকা, জ্ঞানী-অজ্ঞানী, বুদ্ধিমান, বুদ্ধিহীন, পুন্যবান, পুন্যহীন, উঁচ্চ, নীচ, দেব-ব্রহ্ম, যক্ষ, রাক্ষসাদি সকল সত্ব সমূহ বুদ্ধের শরণে মনে পরম শান্তি, ভব ত্রাস হতে রক্ষার আশ্বাস, পুন্য সংগ্রহের উপায় এবং ভব মুক্তির সোজা -সরল মার্গ পেয়েই থাকে।

এরকম বিশাল প্রাণী সমূহকে অনুশীসিত করার জন্য মহাকরুণিক তথাগত বুদ্ধ সময়-কাল-স্থিতি-শ্রোতাগণের সামর্থ্য অনুসারে লোকের নানা বিধি কল্যাণের জন্য বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে তৎকালীন জন ভাষায় ধর্মোপদেশ দিয়েছেন। এ দেশনা কোথাও অতি বিস্তারভাবে এবং কোথাও প্রাচীন এবং বর্তমান উপমা দ্বারা, কোথাও প্রশ্নেত্তর শৈলীতে, কোথাও গূঢ় অতি সার যুক্ত শৈলীতে, বা কোথাও গাথা-পদ্য শৈলীতে অথবা কোথাও সাধারণ কথার ভঙ্গিতে দেশনা করেছেন।

উপরোক্ত বিভিন্ন শৈলীতে প্রদত্ত নানা ধর্মোপদেশে নানা ভিন্নতা হলেও এক এরকম সাম্যতা পাওয়া যায় যে, সম্পূর্ণ দেশনার দিশা এবং লক্ষ্য একই বিন্দুতে কেন্দ্রীত হয়ে থাকে। তা হল সাম্য বিন্দু নির্বাণ। অর্থাৎ সকল দেশনা সমূহ হল একই নির্বাণ রসযুক্ত। সমস্ত দেশনার এঁকই লক্ষণ তাহল নির্বাণ গামিতা। সমস্ত দেশনা সমূহের একই দিশা তা নির্বাণ প্রাপ্তির সাধন স্বরূপ। সমস্ত দেশনা সমূহের সর্বোচ্চ লক্ষ্য হল একমাত্র নির্বাণই। এরকম জ্ঞানের মহা সুরভিত উপবনে দেব-মনুষ্যাদি সত্ব বিরমণ করতে নয়, বরং জ্ঞানামৃত হতে ভব সন্তাপ সমূহের আগুনকে শীতল করার জন্য।

এ পরম মনোরম জ্ঞানোদ্যানে অতি সার গর্ভিত সুত্রবৎ বুদ্ধোপদেশিত কিছু এরকম জ্ঞানপুষ্ফ মন্জুরী হল বোধিপক্ষীয় ধর্ম। যাতে শেষ সম্পূর্ণ ধর্মোপদেশ সমাহিত হয়ে থাকে। এ বোধিপক্ষীয় ধর্ম হল সমস্ত কালখণ্ড বা যুগ সমূহে অজেয়, অভেদ্য, অপরিবর্তনীয় এবং অদ্বিতীয়। এ বোধিপক্ষীয় ধর্ম সমূহের সুলাভ স্তুতি দ্বারা হয়না, স্মরণ দ্বারাও হয়না, দান দ্বারাও হয়না, দামদিয়েও হয়না, বুদ্ধের কৃপার দ্বারাও হয়না, বা অন্য কোন ঋদ্ধিধারী হতেও প্রাপ্ত করা যায়না। এ বোধিপক্ষীয় ধর্মের সুলাভের একমাত্র প্রমাণিত উপায় ইহাই যে, সুদক্ষ, সমর্থ আচার্যাশ্রয়ের অনুসাশনে থেকে এ সমস্ত বোধিপক্ষীয় ধর্মের ভাবনা, বহুলীকতার জন্য নিরন্তর ধ্যানাভ্যাস করতে হয়। এ পরম পবিত্র বোধিপক্ষীয় ধর্ম হল নিম্নরূপ:-

১) চার সতিপট্ঠান বা স্মৃতিকে স্থাপন করার চার স্থান। যথা:-

ক) কায়ানুপস্সনা বা কায়ানুদর্শন

খ) বেনানুপস্সনা বা বেদনানুদর্শন

গ) চিত্তানুপস্সনা বা চিত্তানুদর্শন এবং

ঘ) ধন্মানুপস্সনা বা ধর্মানুদর্শন। এ চার ভাবনা অনুশীলনে প্রবীনতা আনতে হবে।

২) চার সম্যক প্রধান বা চিত্ত শুদ্ধির জন্য চার প্রকারের প্রযত্নই হল চার সম্যক প্রধান।

সেগুলো হল:-

ক) নতুন দুর্গুণ সমূহ গ্রহণ না করা।

খ) পুরাতন দুর্গুণ সমূহ চিত্ত হতে শুদ্ধ করা।

গ) উৎপন্ন সদগুণ সমূহকে রক্ষা করা

ঘ) সদগুণ সমূহের ভাবনাভ্যাসের দ্বারা বৃদ্ধি করা।

৩) চার ঋদ্ধিপাদ অর্থাৎ চার প্রকার চেতনাবলকে বাড়ানো। যেমন:-

ক) ছন্দ বা ধর্ম অভ্যাসের সদেচ্ছার প্রবলতা

খ) বীর্য বা ধ্যানাভ্যাসে উৎসাহ পুরুষার্থ সবসময় জাগিয়ে রাখা।

গ) চিত্ত বা সাধনাভ্যাসে ধ্যান সমাপত্তি সমূহের সরল সম্পাদনের প্রবীনতা।

ঘ) মীমাংসা বা পন্চ স্কন্ধ সমূহের বিদর্শন,পরিপর্ষণ, বিকর্ষণ, পরিসংখ্যায়নের প্রজ্ঞাবল অর্থাৎ ধ্যানে পন্চ স্কন্ধের বিভাজন জ্ঞান আহরণ।

৪) পন্চবল বা সাধক পাঁচ প্রকার ক্ষমতার অনুশীলন। যেমন:-

ক) শ্রদ্ধাবল অর্থাৎ ত্রিরত্ন সমূহে অগাধ ও নিষ্কাম শ্রদ্ধা আনায়ন।

খ) বীর্যবল বা ধর্ম সম্পাদনে উৎসাহিত অর্থাৎ পুরুষার্থ বল। আলস্যতা ত্যাগ।

গ) সতিবল অর্থাৎ স্মৃতিপ্রস্থানের ভাবনা অনুশীলনে থেকে প্রত্যেকটা ক্ষণ উপলব্দ স্মৃতির সব দৃষ্ট, শ্রুত, অনুভূত হল অনিত্য, দু:খ এবং অনাত্ম।

ঘ) সমাধিবল বা সকল ধ্যান সমাপত্তি সমূহে ধ্যানাঙ্গের ইচ্ছিত আরোহ-বিরোহ, অধিষ্ঠান-উত্থানের কুশলতা প্রবীনতার বল।

ঙ) প্রজ্ঞাবল অর্থাৎ ধ্যানাভ্যাসে প্রাপ্ত চৈতন্য সামর্থ যা সর্বদা দু:খ বিনাশিনী, নির্বাণগামিনীই হয়ে থাকে।

৫) পাঁচ প্রকার ইন্দ্রিয় অর্থাৎ সাধকের উক্ত পাঁচ প্রকার বল এতই সমর্থ বা স্বাভাবিক হয়ে থাকে যে, সাধক যখন চায় যে ইন্দ্রিয়ের সাধনাভ্যাসের কুশল সম্পাদনে করে নেয়। পাঁচ ইন্দ্রিয় হল:-

ক) শ্রদ্ধেন্দ্রিয়

খ) বীর্যেন্দ্রিয়

গ) স্মৃতিন্দ্রিয়

ঘ) সমাধিন্দ্রিয় এবং

ঙ) প্রজ্ঞেন্দ্রিয়।

৬) সাত প্রকার বোধ্যঙ্গ অর্থাৎ বোধি হেতু আবশ্যক সাত প্রকারের সামর্থ। যেমন:-

ক) স্মৃতি সম্বোধ্যঙ্গ

খ) বীর্য সম্বোধ্যঙ্গ

গ) ধর্মবিচয় সম্বোধ্যঙ্গ

ঘ) প্রীতি সম্বোধ্যঙ্গ

ঙ) প্রস্রদ্ধি সম্বোধ্যঙ্গ

চ) সমাধি সম্বোধ্যঙ্গ এবং

ছ) উপেক্ষা সম্বোধ্যঙ্গ।

৭) অষ্টাঙ্গিক মার্গ বা অষ্টঅঙ্গযুক্ত মার্গ। এ মার্গ সমূহ হল ভব বিমোচক নির্বাণ প্রদায়ক। আট প্রকার সামর্থযুক্ত মার্গ হল:-

ক) সম্যক দৃষ্টি

খ) সম্যক সংকল্প

গ) সম্যক বাক্য

ঘ) সম্যক কর্ম

ঙ) সম্যক আজীবিকা

চ) সম্যক ব্যায়াম

ছ) সম্যক স্মৃতি ও

জ) সম্যক সমাধি।

উপরোক্ত

১) স্মৃতি প্রস্থান———- ৪

২) সম্যক প্রধান———-৪

৩) ঋদ্ধিপাদ————-৪

৪) বল———————৫

৫) ইন্দ্রিয়——————৫

৬) বোধ্যঙ্গ—————-৭

৮) আর্য মার্গ————-৮

———————-

মোট বোধিপক্ষীয় ধর্ম- ৩৭ প্রকার।

এ বোধিপক্ষীয় ধর্ম নির্বিবাদ ধর্মস্কন্ধ সমূহের দেশনা করে পৃথিবীর সকল মনুষ্যের মুক্তির মার্গকে নিষ্কণ্ঠক রূপ হতে প্রশস্ত করে দিয়েছে। যাঁরা এ সাঁইত্রিশ প্রকার বোধিপক্ষীয় ধর্ম অনুশীলন করবেন, তাঁরাই ভব সাগর হতে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হবেন।

এ প্রসঙ্গে বুদ্ধ সংযুক্ত নিকায়ের দেবপুত্র সংযুক্তের চন্দিমা সুত্রে বলেছেন-

‘ দসবল সেলপ্পভবা,

নিব্বানমহাসমুদ্দ পরিযন্তা।

অট্ঠঙ্গমগ্গ সলিলা,

জিনবচন নদী চিরংবহতু।

অর্থাৎ, দশবলধারী সম্যক সম্বুদ্ধরূপী হিমপর্বত শিখর হতে, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গরূপী নির্মল নদী হতে পরিপূর্ণ, বুদ্ধজ্ঞানরূপী মনোরম মহাসমুদ্র পর্যন্ত, সদা-সর্বদা নিরন্তর লোক মঙ্গল হেতু প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

২) সঠিক বুদ্ধ বাণী পরীক্ষার দ্বিতীয় পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বুদ্ধ বলেছেন:-

‘ আনন্দ! যে কেহ কখনও স্বাধ্যায়- সাধনাভ্যাসের দ্বারা ইহা অনুভব করে যে, বুদ্ধের এ বাক্য রাগ (আসক্তি)ক্ষয়ে সহায়ক, রাগকে বৃদ্ধিতে নয়, দ্বেষ নিরসনে সহায়ক হয়, দ্বেষ বৃদ্ধিতে নয়, মোহ ক্ষয়ে সহায়ক হয়, মোহ বৃদ্ধিতে নয়, তাহলে তাকেই বুঝতে হবে যে, ইহা তথাগত বুদ্ধেরই উপদেশ বা বাণী। সংক্ষেপে যে বাক্য সমূহে রাগ, দ্বেষ ও মোহ ধ্বংস হয়ে যায়, বুঝতে হবে তা বুদ্ধোপদেশ। এতে সত্য নিহিত রয়েছে।

যে সমস্ত বাক্যে রাগ, দ্বেষ ও মোহ বৃদ্ধি হয়, বুঝতে হবে তা কদাপি বুদ্ধ বচন নয়। এরকম জল এবং দুধের বিবেকের সাথে ধর্ম যোদ্ধাগণের দ্বারা পালি ত্রিপিটকের গভীরভাবে বিশ্লেষণাত্মক, জ্ঞান পরায়ণ হয়ে নিজের শ্রেষ্ঠ সুলাভ সুনিশ্চিত করা উচিত।

আনন্দ! যে কোন সময়ে সম্পূর্ণ পৃথিবীতে তথাগতের উপদেশ সর্বদা স্ব প্রমাণিত, সত্যাপিত ও নির্বিবাদ থাকবে।

আনন্দ! ব্যর্থতায় ব্যথিত হবেনা। ধর্ম স্বয়ংই স্বয়ংকে রক্ষা করবে। এবং সাধনাভ্যাসিদেরকে কল্যাণ করতে থাকবে।

Article Tags:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *